সেতার সুরে বাঁধতে শেখা [ সেতার শিক্ষা – পর্ব ৩ ]

সেতার সুরে বাঁধতে শেখা নিয়ে আজকের আলোচনা। আজকের পর্ব, সেতার সুরে বাঁধতে শেখা নিয়ে। আমরা শিক্ষার্থীদের জানাতে চাই যে, এই যন্ত্রটি শেখার প্রারম্ভে, সেতার সুর করবার পদ্ধতি কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে আর এটা খুবই স্বাভাবিক। সেতারযন্ত্রটি বুঝে নেয়া থেকে শুরু করে, স্বরের কম্পনগুলো বুঝে উঠতে সকলেই বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। কান তৈরি হওয়া ছাড়াও, সেতারের মান, তারের মান, ব্রিজের জোয়ারি, তারের খুটির গোড়ায় চক দেয়াসহ বেশ কিছু ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে আমাদের।

এবার সেতার যন্ত্রটি ভালো করে চিনে নেয়ে যাক। ঘরানা এবং সেতারের রকমফের অনুযায়ী, তারের সংখ্যা ঊনিশ থেকে বাইশ পর্যন্ত হতে পারে। সেতারে আমরা দুই সারির তার দেখতে পাই। এখানে দ্বিতীয় সারির তারকে বলা হয় “তরফ” বা “তরফদার”। ভারতীয় তারযন্ত্রসমূহের অধিকাংশেই তরফদারের ব্যবহার আমরা দেখতে পাই। পরিবেশিত রাগের স্বর অনুসারে সুর করে রাখা হলে, শিল্পী যেকোন স্বর বাজালে স্বয়ংক্রিয় ভাবে বেজে ওঠাই তরফদারের মূল কাজ। এতে একটি বিশেষ আওয়াজ পাওয়া যায়, যা যন্ত্রগুলোর মূল আওয়াজে একটি পরিপূর্ণতা এনে দেয়। উপরের সারির তারগুলো ঘরানাভেদে, সাজ এবং সুরে বাঁধার নিয়ম বদলে যায়। সেতার দাঁড় করিয়ে দেখলে, ডানদিকের প্রথম তারেই মূল বাজটি বাজানো হয়। এই তারের নাম “নায়কি” কিংবা “বাজ”। বাকি তারগুলোর অধিকাংশই একটি আবহ তৈরি করবার কাজে নিয়জিত থাকে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে, একটি স্কেল নির্বাচন করে, তিনটি সপ্তক ব্যবহার করা হয়। এই তিন সপ্তকের নাম ক্রমানুসারে, মন্দ্র সপ্তক, মধ্য সপ্তক এবং তার সপ্তক। মন্দ্র সপ্তককে “খড়জ” বলেও সম্বোধন করা হয়। সেতার সাধারণত “সি শার্প” অথবা “ডি” স্কেলে সুর বাঁধা হোলেও, পন্ডিত রবিশঙ্কর এবং ওস্তাদ রাঈস খাঁসহ বেশ কয়েকজন শিল্পীকে অনেক সময় “ডি শার্প” স্কেলেও সেতার বাঁধতে দেখা গেছে। গুণীজনদের মতে, সেতার সুর করার আদর্শ স্কেল “ডি”। বলা হয়ে থাকে, ডি স্কেলেই তারের সঠিক টান থাকে যার কারণে সেতারের আওয়াজে পর্যাপ্ত “নিকাস” বা “রেশ” পাওয়া সম্ভব। খড়জ পঞ্চম সেতারে, “পঞ্চম” বা “পা” স্বরে বাঁধা তারটির আগে, মন্দ্র সপ্তক বাজানোর জন্য দুটো খড়জের তার থাকে বলেই এই ধরনের সেতারকে খরজ পঞ্চম বলা হয়। অন্যদিকে, গান্ধার পঞ্চম সেতারে পঞ্চমে বাঁধা তারের আগে মধ্য সপ্তকের “গান্ধার” কিংবা “গা” তে বাঁধা তার থাকায় এই ধরনের সেতারের জনপ্রিয় নাম, গান্ধার পঞ্চম সেতার। জেনে রাখা ভালো, প্রতিটি স্বরের চলিত নামের পূর্ণাঙ রূপটি ছোট করে লেখা থাকে। সা-সরজ, রে-রেখাব/ হ্রিসব, গা-গান্ধার, পা-পঞ্চম, ধা-ধৈবত এবং নি-নিষাদ/নিখাদ।

সব ধরনের সেতারে, তারের সাজ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক রকমের হয়। সেতার দাঁড় করিয়ে দেখলে, বাঁ দিকের প্রথম দু’টো তারের নাম “চিকারি”। এই তার দুটো মধ্য এবং তার সপ্তকের “সরজ” কিংবা “সা” তে বাঁধা হয়। এরপরের তারটি বাঁধা হয় মধ্য সপ্তকের “পঞ্চম” কিংবা “পা” তে। এই তিনটি তার সুরে বাঁধার কায়দা সব সেতারেই একই রকম। খড়জ পঞ্চমের ক্ষেত্রে, এরপরের দুটি তার হয়ে যায় মন্দ্র সপ্তকের সা (যাকে আমরা খড়জের সা বলেও সম্বধন করি), এরপর মন্দ্র সপ্তকের পঞ্চম/পা। গান্ধার পঞ্চমের ক্ষেত্রে, এই দুটি তারের জায়গায় শুধু একটি তার ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণত সুর করা হয় গান্ধার/গা তে। এরপরের দুটি তারের নাম “জোড়/জোড়া” যা মধ্য সপ্তকের সা তে এবং নায়কি যা মধ্য সপ্তকের মা সুরে বাঁধা হয়। এই দু’টি তার সব সেতারেই একই ভাবে সুর করা হয়। আমরা এবার খড়জ এবং গান্ধার পঞ্চম সেতার দুটি সুর করার উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করব।
সেতার সুর করবার আগে, এই কাজের জন্য সেতার বিশেষ ভাবে ধরবার উপায় বুঝে নেয়া খুবই জরুরি। প্রথমে সাধারণ আসন করে বসতে হবে শিক্ষার্থীদের। এবার সেতার রাখতে হবে কোলের ওপরে। ডান উরুর নরম মাংসের ওপরে বলিষ্ঠ ভাবে রাখতে হবে সেতারের ব্রিজ এবং শেষ পর্দার ঠিক মাঝখানে। একইভাবে, তরফের প্রথম চারটি খুটির অংশ যাবে বাঁ উরু বরাবর। এক্ষেত্রে, সেতারের তুম্বা থাকবে মেঝেতে এবং ওপরের অংশ ডান বাহুর শক্তি দিয়ে কনুই থেকে কব্জির আগ পর্যন্ত পুরোটা দিয়ে সেতারটিকে শক্ত করে আটকে রাখতে হবে। সেতারের খুটি গুলোর ঘর্ষণ স্বাভাবিক রাখতে হাতের ওজন নিয়ন্ত্রন করতে হয়। এই কায়দাটি সঠিক উপায়ে অবলম্বন করতে পারলে, সেতার সুর করবার প্রাথমিক কিছু অসুবিধা দূর হয়ে যাবে। বর্ণিত কায়দাটি সকল সেতারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

এবার স্কেল নির্ধারণ করা যাক। সেতারের আদর্শ স্কেল “ডি” ধরা হোলেও, নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য “সি শার্প” স্কেল বেছে নেয়া যেতে পারে, কারণ এতে সেতারের আওয়াজ খুব বেশি গম্ভীর না হয়েও তারের টান বেশকিছুটা নরম হয়ে আসে। তাই নতুন শিক্ষার্থীদের আঙ্গুলে চাপ কম পড়বে। সেতার সুর করতে কান তৈরির জুড়ি নেই। নিয়মিত তানপুরার সাথে সেতারের চর্চা অব্যাহত রইলেই এর সুফল পাওয়া যাবে। বিভিন্ন রাগে স্বরগুলোর স্পন্দন বদলে যাওয়ায়, ডিজিটাল টিউনার দিয়ে অনেকসময় সঠিকভাবে সেতার সুর করা যায় না। তবে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সুবিধার্থে প্রাথমিকভাবে টিউনার ব্যবহার করতে পারেন।

প্রথমে সুর করতে হবে “জোড়ের” তার। এই তার সুর করতে হবে মধ্য সপ্তকের সা তে। নায়কীর তারকে এক নাম্বার হিসেবে গুনলে, জোড়ার তার হয় দ্বিতীয়। তানপুরা অথবা টিউনারের সাহায্যে মাপ মত খুটি ঘুরিয়ে নিতে হবে। খুটি যেনো ঢিলে না হয়ে যায় সেটা লক্ষ্য রেখে পরিমান বুঝে ওজন রাখতে হবে বাঁ হাতে। পরবর্তী তারগুলো আমরা এই জোড়ের সাহায্যেই সুর করবার চেষ্টা করব। এরপরের তারটি (৩ নম্বর) সুর করতে হবে মন্দ্র সপ্তকের পা তে। টিউনার বাঁ তানপুরা ব্যবহার করলেও, আগেই সুর করা জোড়ের তার এবং এই মন্দ্র সপ্তকের তারে ঠিক পরপর আঘাত করলেই একটি নতুন স্পন্দন লক্ষ্য করা যাবে যা দিয়ে আরও সুচারু ভাবে সুর করা সম্ভব। এবার পরের তারটি সুর করতে হবে মন্দ্র সপ্তকের সা। এই তারকেই মূলত খড়জের তার বলা হয়। খড়জের গাম্ভীর্য আনতে, এই তারটি বেশ ভারী এবং বেশ ঢিলে রাখতে হয়। তাই এই তারটি সঠিক সুরে আনা তুলনামূলকভাবে কঠিন। নিচ থেকে পঞ্চম তারটি বাঁধা হবে মধ্য সপ্তকের পঞ্চম/পা তেই। এরপর ষষ্ঠ এবং সপ্তম তার দুটি চিকারি। ষষ্ঠ চিকারি সুর করা হবে মধ্য সপ্তকের সা এবং সপ্তম চিকারিটি সুর করা হবে তার সপ্তকের সা তে। এই তারগুলো বেশ হাল্কা এবং সরু হওয়ায় বেশ উঁচু স্পন্দনের আওয়াজ আসবে। উপরের সারির একদম শেষে আমরা সুর করবো নায়কীর তার, যা গণনার নিয়মে এক নম্বর তার। এই তার দিয়ে উভয় সুর করতে হবে নির্ধারিত স্কেলের শুদ্ধ মা/মধ্যমে। গান্ধার পঞ্চম সেতারের ক্ষেত্রে, নায়কির তারকে এক (০১) নম্বর তার হিসেবে গুনলে, জোড়ের (দ্বিতীয় তার) পরের দুটি খড়জের যায়গায় থাকবে শুধু একটি গান্ধার, যা সুর করতে হবে মধ্য সপ্তকের গান্ধার/গা তে। এবার চিকারি থেকে জোড়ের আগ পর্যন্ত সব তার মিলিয়ে একটি “ছেড়” দিয়ে সা এর পর্দায় আঙ্গুল রেখে যদি মনেহয় সব কিছু ঠিক লাগছে, তাহলে আমরা সেতার সুর করবার পরের অংশে যাবার জন্য প্রস্তুত।
এবার তরফদার সুর করার সময়। এই তারগুলো সুরে বাঁধতে ডান হাতের মধ্যমার নখ কিছুটা বড় করে রাখতে হবে। ওপরের এবং নিচের সারির তারের মাঝে জায়গা কম থাকায় মিজরাব দিয়ে সুর করা খুব কঠিন, তাই ডান হাতের মধ্যমার নখ দিয়েই তার থেকে আওয়াজ বের করতে হবে। গান্ধার পঞ্চম এবং খড়জ পঞ্চম সেতারের তরফে, নিচ থেকে গুনলে, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তার বাদ দিয়ে বাকি সবগুলো সুর করার নিয়ম একই। খড়জ পঞ্চম সেতারে, প্রথম তিনটি তার ক্রমাগত ভাবে মন্দ্র সপ্তকের “নি”, মধ্য সপ্তকের সা এবং মধ্য সপ্তকের রে থেকে শুরু করে খুটির সংখ্যার ওপরে নির্ভর করে তার সপ্তকের মা পর্যন্ত সুর করা যেতে পারে। অন্যদিকে, গান্ধার পঞ্চম সেতারে প্রথম তার মন্দ্র সপ্তকের “নি”, মধ্য সপ্তকের “সা”, এবং এরপরেই মন্দ্র সপ্তকের “ধৈবত/ধা” তে সুর করা হয়। ইমদাদখানি সেতার বাদকেরা প্রায়শই বাঁ হাতের কড়ে আঙ্গুলের নখ দিয়ে এই তারটি বাজিয়ে থাকেন। এই তারের পর, গান্ধার পঞ্চম সেতারেও তার সুর করার নিয়ম একই।
সবশেষে, সেতারের তার নিয়ে কিছুটা হলেও বিস্তারিত জানা জরুরি। হরেক রকম “ব্র‍্যান্ড” এর তার পাওয়া যায় এই যন্ত্রের। নটরাজ এবং করুণা নামের দুটি ব্র‍্যান্ডের তার মাপ দিয়ে কেটে বিক্রি হয় বাজারে। এতে একটা সেতারে ব্যবহার করাবার মতন তার নম্বরসহ দেয়া থাকে। তবে সেতারে বাজালে তারের কয়েল কিনে রাখাই ভালো। তিন থেকে চার রকম মাপের তার ব্যাবহার করা হয় সেতারে। এই অঞ্চলে (বাংলাদেশ ও ভারত) তারের কিছু চলিত মাপ আছে যা দিয়ে দকানিরা সহজেই বুঝে যায়। তবে বিদেশে তার কিনতে গেলে সঠিক মাপ ছাড়া তার পাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য। নিম্নে তারের চলিত মাপসহ মূল মাপ, দুই ধরনের সেতারের জন্যই উল্লেখ করা হলো।

খরজ পঞ্চম সেতার।

১ নম্বর: (নায়কি)– চলিত মাপ ৩ নম্বর – মূল মাপ ০.৩০ স্টিল।
২ নম্বর: (জোড়)–চলিত মাপ ২৭ নম্বর – মূল মাপ ০.৪০ তামা।
৩ নম্বর: (পঞ্চম)– চলিত মাপ ৩৩ নম্বর – মূল মাপ ০.৫৫ তামা।
৪ নম্বর: ( খড়জ )–চলিত মাপ ৩৮/৪০ নম্বর – মূল মাপ ০.৮৫ পিতল।
৫ নম্বর: (পঞ্চম) – চলিত মাপ ৩ নম্বর – মূল মাপ ০.৩০ স্টিল।
৬ এবং ৭ নম্বর: (চিকারি) এবং তরফদার –চলিত মাপ ০– মূল মাপ ০.২২ স্টিল।

গান্ধার পঞ্চম সেতার
১ নম্বর: (নায়কি) – চলিত মাপ ৩ নম্বর– মূল মাপ ০.৩০ স্টিল।
২ নম্বর: (জোড়)– চলিত মাপ ২৭ নম্বর– মূল মাপ ০.৪০ তামা।
৩ নম্বর: (গান্ধার)– চলিত মাপ ৩ নম্বর– মূল মাপ ০.৩০ স্টিল।
৪ নম্বর: (পঞ্চম) চলিত মাপ ৩ নম্বর– মূল মাপ ০.৩০ স্টিল।
৫, ৬ এবং তরফদার – চলিত মাপ ০ – মূল মাপ ০.২২ স্টিল।

গান্ধার পঞ্চম সেতার সুর করা নিয়ে সেতার গুরুকুলে একটি টিউটেরিয়াল বানিয়েছি আমরা, যা দেখলে সেতার কিভাবে সুর করতে হয়, অনায়াসে বুঝে ফেলা সম্ভব। ভিডিওটি পাওয়া যাবে সেতার গুরুকুলের তিন নম্বর পর্বে। দেখবার আমন্ত্রন রইলো।

 

Leave a Comment